কেমন ছিল হযরত ওমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু এর শাসন আমল

 

হযরত ওমর রাঃ এর শাসনামল।

হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর শাসনামল (৬৩৪–৬৪৪ খ্রিষ্টাব্দ) ইসলামের ইতিহাসে এক স্বর্ণযুগ হিসেবে পরিচিত। তাঁর ১০ বছরের শাসনামলে কেবল বিশাল রাজ্য জয়ই হয়নি, বরং একটি আদর্শ ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রকাঠামো প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

​ওমর (রা.)-এর শাসনামলের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

​১. ন্যায়বিচার ও কঠোর আইন শাসন

​ওমর (রা.)-এর শাসনামলে আইনের ঊর্ধ্বে কেউ ছিল না। এমনকি তাঁর নিজের সন্তানও ভুল করলে তিনি শাস্তির ক্ষেত্রে কোনো শিথিলতা দেখাননি। বিচার বিভাগকে তিনি সম্পূর্ণ স্বাধীন করেছিলেন এবং বড় বড় সেনাপতি বা গভর্নরদের ভুলত্রুটির জন্য জবাবদিহি করতে হতো।

​২. প্রশাসনিক সংস্কার ও নতুন বিভাগ তৈরি

​তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য অসংখ্য নতুন বিভাগ (Diwan) প্রতিষ্ঠা করেন, যা বর্তমান আধুনিক রাষ্ট্রের অন্যতম ভিত্তি।

  • হিজরি সন: তাঁর আমলেই হিজরি ক্যালেন্ডার প্রবর্তন করা হয়।
  • আদালত ও বিচারক: বিচার ব্যবস্থার জন্য আলাদা বিভাগ গঠন করেন।
  • পুলিশ ও গোয়েন্দা: জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ বাহিনী ও রাতের পাহারাদার ব্যবস্থা চালু করেন।
  • সেনাবাহিনী: সৈন্যদের জন্য স্থায়ী বেতন ও সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করেন।

​৩. বিশাল সাম্রাজ্যের বিস্তার

​তাঁর সময়ে ইসলামি সাম্রাজ্যের আয়তন অভূতপূর্বভাবে বৃদ্ধি পায়। তৎকালীন দুই পরাশক্তি— পারস্য (রোম) এবং বাইজেন্টাইন (রোমান) সাম্রাজ্যের বড় অংশ মুসলমানদের অধীনে আসে। বিশেষ করে মিশর, সিরিয়া, ইরাক এবং পবিত্র জেরুজালেম বিজয় তাঁর শাসনকালের গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য।

​৪. সামাজিক নিরাপত্তা ও বায়তুল মাল

​ওমর (রা.) জনগণের কল্যাণের জন্য ‘বায়তুল মাল’ বা রাষ্ট্রীয় কোষাগারকে সুসংগঠিত করেন।

  • ভাতা ব্যবস্থা: তিনি শিশু, বৃদ্ধ এবং পঙ্গু ব্যক্তিদের জন্য রাষ্ট্রীয় ভাতার ব্যবস্থা করেছিলেন।
  • খাদ্য নিরাপত্তা: দুর্ভিক্ষের সময় তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছিলেন এবং জনগণের দ্বারে দ্বারে গিয়ে খাদ্যের খোঁজ নিতেন।

​৫. অবকাঠামো উন্নয়ন

​কৃষিকাজের সুবিধার্থে তিনি অসংখ্য খাল খনন করেন। যাতায়াত ও ব্যবসার জন্য নতুন নতুন রাস্তা এবং শহর (যেমন: কুফা, বসরা, ফুসতাত) নির্মাণ করা হয়।

​৬. ব্যক্তিগত জীবন ও মহত্ব

​বিশাল সাম্রাজ্যের অধিপতি হয়েও তাঁর জীবন ছিল অত্যন্ত সাধারণ। তাঁর পোশাকে তালি থাকত এবং তিনি মাটিতে বা সাধারণ চাটাইয়ে ঘুমাতেন। জনগণের দুঃখ বুঝতে তিনি প্রায়ই ছদ্মবেশে রাতের বেলা মদিনার রাস্তায় ঘুরে বেড়াতেন।

​এক কথায়, ওমর (রা.)-এর শাসনামল ছিল শক্তি এবং নম্রতার এক অনন্য সংমিশ্রণ, যেখানে শাসক ছিলেন জনগণের প্রকৃত সেবক।